Eln
by Jibon Khanপূর্বাঞ্চলের এক সুন্দর ও সমৃদ্ধ রাজ্য ছিল— রূপনগর। চারদিকে সবুজ মাঠ, নদী আর ব্যস্ত বাজারে ভরা ছিল এই রাজ্য। সেখানে শাসন করতেন ন্যায়পরায়ণ ও সাহসী সুলতান খালেদ সাইফুদ্দিন। তিনি প্রজাদের খুব ভালোবাসতেন, আর প্রজারাও তাকে সম্মান করত।
তার স্ত্রী ছিলেন বেগম রুকাইয়া সুলতানা। তিনি যেমন সুন্দরী ছিলেন, তেমনি ভদ্র, দয়ালু ও ধর্মপরায়ণ। তাদের দুই ছেলে ছিল—রায়হান ও হাসান। মা–বাবার আদরে তারা সুখে বড় হচ্ছিল।
কিন্তু হঠাৎ একদিন বেগম রুকাইয়া খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সুলতান অনেক হাকিম ও ডাক্তার ডেকে আনলেন। অনেক চিকিৎসা হলো, কিন্তু কেউ তার অসুখ ভালো করতে পারল না। দিন দিন তিনি আরও দুর্বল হয়ে গেলেন।
একদিন শুয়ে শুয়ে তিনি জানালা দিয়ে বাগানের এক গাছে পাখির বাসা দেখছিলেন। সেখানে একটি পাখি, তার সঙ্গী আর তাদের দুইটি ছোট ছানা ছিল। এই দৃশ্য দেখে তার ভালো লাগত। কিন্তু কিছুদিন পর মা পাখিটি মারা গেল। পরে বাবা পাখি আরেকটি পাখিকে নিয়ে এলো।
একদিন বাবা পাখি খাবার আনতে গেলে নতুন পাখিটি দুইটি ছানাকে বাসা থেকে ফেলে দিল। ছানাগুলো মাটিতে পড়ে মারা গেল। এই দৃশ্য দেখে বেগম খুব কষ্ট পেলেন। তিনি ভাবলেন, “আমারও যদি মৃত্যু হয়, আর সুলতান যদি আবার বিয়ে করেন, তাহলে নতুন স্ত্রী কি আমার ছেলেদের ভালোবাসবে?”
এই চিন্তায় তিনি ভেঙে পড়লেন। তিনি রায়হান ও হাসানকে ডেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, “তোমরা সবসময় একসাথে থাকবে, কখনও ঝগড়া করবে না।” ছেলেরা কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আম্মা, তুমি ভালো হয়ে যাবে।” তিনি মৃদু হাসলেন।
এরপর তিনি সুলতানকে ডেকে বললেন, “আমি যদি না থাকি, আপনি আর বিয়ে করবেন না। আমাদের ছেলেদের নিজের হাতে মানুষ করবেন।” সুলতান কাঁদতে কাঁদতে কথা দিলেন। সেই কথা শোনার পরই বেগম শান্ত মনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
বেগমের মৃত্যুর পর সুলতান খুব ভেঙে পড়লেন। তিনি ঠিকমতো রাজকার্যও করতেন না। মন্ত্রীরা বলল, “হুজুর, ছেলেদের ভবিষ্যতের জন্য আপনাকে আবার বিয়ে করতে হবে।” অনেক অনুরোধের পর তিনি নাজমা খাতুনকে বিয়ে করলেন।
কিন্তু নাজমা ভালো মানুষ ছিলেন না। রায়হান ও হাসান তাকে “আম্মা” বলে ডাকলে তিনি রেগে যেতেন। পরে তিনি সুলতানকে বললেন ছেলেদের আলাদা ঘরে রাখতে। সুলতান কষ্ট পেলেও রাজি হলেন।
সময় কেটে গেল। দুই ভাই বড় হয়ে যুবক হলো। একদিন খেলতে খেলতে রায়হানের বল নাজমার ঘরে চলে যায়। বল আনতে গেলে নাজমা তাকে খারাপ কথা বলে এবং ভুল পথে টানতে চায়। রায়হান রাগ করে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে।
নাজমা রাগে নিজের কাপড় ছিঁড়ে সুলতানের কাছে মিথ্যা অভিযোগ করল—রায়হান নাকি তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। সুলতান খুব রেগে গেলেন এবং কিছু না শুনেই রায়হানকে রূপনগর থেকে বের করে দিলেন।
রায়হান সব কথা হাসানকে বলল। হাসান বলল, “ভাই, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।” তাই দুই ভাই একসাথে রাজ্য ছেড়ে চলে গেল।
জঙ্গলে গিয়ে তারা খুব ক্লান্ত হয়ে একটি গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়ল। রাতে একটি সাপ হাসানকে কামড় দিল। সে ঘুমের মধ্যেই মারা গেল। সকালে উঠে রায়হান ভাইকে মৃত দেখে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। সে কফন কিনতে পাশের এক নগরে গেল।
সেদিন সেই নগরের শাসক মারা গিয়েছিল। সেখানে নিয়ম ছিল—শবযাত্রার সামনে যে প্রথম পড়বে, তাকেই নতুন শাসক বানানো হবে। ঘটনাক্রমে রায়হানকেই নতুন শাসক বানানো হলো।
এদিকে আল্লাহর রহমতে হাসান আবার জীবিত হয়ে উঠল। সে ভাইকে খুঁজতে খুঁজতে সেই নগরে এলো। কিন্তু সৈন্যরা তাকে ধরে এক ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দিল। ব্যবসায়ীর জাহাজ আটকে ছিল। বলা হচ্ছিল, একজন মানুষ দিলে জাহাজ চলবে। কিন্তু হাসানের পা রাখতেই জাহাজ নিজে থেকেই চলতে শুরু করল। ব্যবসায়ী অবাক হয়ে তাকে সঙ্গে নিল।
অন্য এক রাজ্যে গিয়ে তারা জানল—সেদিন রাজকুমারী সাইরার বিয়ের জন্য পাত্র বাছাই হবে। অনেক ধনী ও প্রভাবশালী মানুষ এসেছিল। কিন্তু রাজকুমারী সবার মাঝে হাসানকেই পছন্দ করলেন এবং তার গলায় মালা পরিয়ে দিলেন।
হাসান বলল, “আমি গরিব মানুষ, আপনার যোগ্য নই।” কিন্তু সাইরা বললেন, “আমি আপনাকেই স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছি।” বাবার আপত্তি সত্ত্বেও তিনি হাসানের সঙ্গে চলে গেলেন।
এভাবেই রূপনগরের দুই ভাই আলাদা পথে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করল—একজন শাসক হলো, আরেকজন পেল নতুন সংসার। কিন্তু তাদের জীবনের গল্প তখনও শেষ হয়নি।